বড় মসজিদ ময়মনসিংহের ইতিহাস

বড় মসজিদ ময়মনসিংহের ইতিহাস বহু পুরনো। কিংবদন্তির জনপদ ময়মনসিংহ। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত ময়মনসিংহ এখন বিভাগীয় মহানগরী। ‘আইন-ই-আকবরী’তে অঞ্চলটির বিবরণ রয়েছে। ‘আকবরের সময় মোমেনশাহী পরগনার শাসনকর্তা মোমেনশাহ্ নামানুসারে পরগনার নামকরণ করা হয় মোমেনশাহী। পরবর্তী সময়ে আলাপ সিং পরগনার ‘সিংহ’ যুক্ত হয়ে উচ্চারণ পরিবর্তনে তা হয় ময়মনসিংহ।’ ইসলামী বিশ্বকোষ: ১৬ খ. ২য় ভাগ। তবে বাংলার স্বাধীন সুলতান ষোড়শ শতাব্দী সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ পুত্র সৈয়দ নাসির উদ্দিন শাহ নামে প্রতিষ্ঠিত নাসিরাবাদ রাজ্যকে কেন্দ্র করে আদি ময়মনসিংহ গোড়াপত্তন। ১৭৮৭ সালের পহেলা মে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৩ অক্টোবর ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে পথ চলা শুরু করি।

বড় মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সহ প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী এই প্রবন্দে উল্লেখ করা হয়েছে। যেন পাঠক মহলে বড় মসজিদের পুরো ইতিহাস জানতে পারে।

হযরত শাহজালাল (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর আগমনের ২৫০ বছর আগে ৪৪৫ হিজরি মোতাবেক ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী রহমতুল্লাহি আলাইহি বৃহত্তর ময়মনসিংহে ইসলাম প্রচার করেন। ইমান- ইবাদতের চেতনায় উজ্জীবিত ময়মনসিংহের মিনারে মিনারে ধ্বনিত হয় তাওহীদ, রিসালাত অমিয় বাণী। তাই বড় মসজিদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

বড় মসজিদ
বড় মসজিদ

ইদ, জুম’আর দিন হাজার হাজার মানুষ বাস- ট্রেনে চড়ে ও পায়ে হেটে বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসেন ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় মসজিদ তথা পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান বড় মসজিদের ফয়েজ নেওয়ার জন্য।

কোতোয়ালি থানা সংলগ্ন চক বাজার নামক স্থানে প্রায় পৌনে দু‘শ বছর আগে (১৮৫০/১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে) তৎকালীন জমিদারের মৌখিক অনুমতিক্রমে গণ্যমান্য মুসলমানগন নামাজ আদায়ের জন্য টিনের ছাপড়া মসজিদ তৈরি করেন। কলের স্রোতধারায় এ মসজিদটি ময়মনসিংহের গর্ব ও ঐতিহ্যের স্মারক বড় মসজিদ। ১৯৩৫ সালে বেঙ্গল ওয়াক্‌ফ অ্যাক্টের অধীনে মসজিদটি পাবলিকে টেস্টে পরিণত হয়।

ময়মনসিংহের বড় মসজিদ

প্রায় ০১.৯ একর জমির উপর নির্মিত ‘বড় মসজিদ’ একটি তিনতলা সুরম্য স্থাপত্য নিদর্শন। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১০৫ ফুট ও প্রস্থ ৮৫ ফুট। প্রতি তালয় নামাজের কাতার ১৮টি। অন্তত পাঁচ হাজার মুসল্লি এখানে একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।
অপূর্ব অলঙ্করণে সুশোভিত মসজিদের ১২৫ ফুট উঁচু দু ‘টি মিনার ও একটি কেন্দ্রীয় বৃহৎ গম্বুজে ব্যবহৃত হয়েছে চিনামাটির তৈজসপত্রের টুকরা দিয়ে তৈরি নান্দনিক নকশা আস্তরণ। মসজিদের পশ্চিম দিকে রয়েছে দুটি ফাঁকা গম্বুজ। ছাদের রেলিং দেওয়া হয়েছে গম্বুজের আদলে ঢেউ খেলানো শোভায়।

মসজিদের তিনটি প্রবেশ-মুখে আছে অনুচ্চ গম্বুজ শোভিত ফটক। মসজিদের আঙ্গিনাকে অলংকৃত করা হয়েছে আরো কয়েকটি বৃহদাকৃতির অনুচ্চ গম্বুজ ও লতাপাতার বিন্যস্ত থোকায় থোকায় আঙ্গুর শোভিত ও অনুচ্চ নকশা দেয়াল দিয়ে। মসজিদে প্রবেশ মুখে রয়েছে জলকেলির রং-বেরঙের মাছের শোভামণ্ডিত স্বচ্ছ-পবিত্র পানির দুটি হাউজ ও আলাদা অজুখানা।

মসজিদের অভ্যন্তরে মূল্যবান মোজাইক পাথরের মেঝে, কার্পেট, দেয়ালজুড়ে শ্বেত-শুভ্র মনোরম টাইলস, সুদৃশ্য ঝাড়বাতি, অত্যাধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ও তাপানোকুল ব্যবস্থাপনা মুসল্লি মননে জান্নাতি আবহ ও ইবাদতে একাগ্রতা জাগিয়ে তোলে। পবিত্র রমজানে অসংখ্য মুসল্লির বড় মসজিদে ইতিকাফ করেন। মসজিদ সংলগ্ন দুটি বহুতল ভবনে রয়েছে সুবিশাল এক জামিয়া। এমনকি উচ্চতর গবেষণা বিভাগ রয়েছে। এখানে বিদগ্ধ আলেমগনের তত্ত্বাবধায়নে ‘দাওরা হাদিস’ পর্যন্ত পাঠদান করা হয়।

রয়েছে সমৃদ্ধ ও ধর্মীয় পাঠাগার। মসজিদ মার্কেটেও রয়েছে কুরআন-কিতাব, টুপি, জায়নামাজ, তাসবিহ বিশাল সমারোহ।
প্রায় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত মিসর থেকে আগত হযরত মওলানা আব্দুল আওয়াল রহমতুল্লাহি আলাইহি ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘মিসরী ক্বারী’ সাহেব নামে পরিচিত।

আরো পড়ুন: হাদিস সংকলনের ইতিহাস

১৯৪১ থেকে ১৯৯৭ খ্রি. পর্যন্ত হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহমতুল্লাহি আলাইহি)-এর সুহবতপ্রাপ্ত, মুজাদ্দিদে মিল্লাত, যামানার কুতুব হযরত মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহমতুল্লাহি আলাইহি) খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।


ইস্যু – সমকালীন চিন্তাধারায় নতুন পথচলা


তাঁর পবিত্র ফায়েজ, সান্নিধ্য, দোয়া, দাওয়াত ও খেদমতে ময়মনসিংহের বড় মসজিদের দ্যুতি বিশ্বব্যাপী। মসজিদ পরিচালনা কমিটি আল্লামা আব্দুল হক (দা.বা.)-এর উদ্যোগে এ মহান আধ্যাত্মিক সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা নিদর্শনস্বরূপ মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসাটির নামকরণ করেন ‘জামিয়া ফয়জুর রহমান (রহ.)’।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.